Import Policy Order ২০২৬–২০২৯: কী কী পরিবর্তন এলো, নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত পণ্যের সম্পূর্ণ চিত্র
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৪ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে গেজেট প্রকাশ করে নতুন Import Policy Order ২০২৬–২০২৯ জারি করেছে — Imports and Exports (Control) Act, 1950-এর ধারা ৩(১) এর ক্ষমতাবলে। এটি প্রতিস্থাপন করেছে আগের Import Policy Order ২০২১-২৪ কে, যার মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৪ শেষ হয়ে গেলেও নতুন আদেশ না আসা পর্যন্ত তা কার্যকর ছিল।
শুধু আইনি প্রতিস্থাপন নয় — নতুন এই নীতিতে আমদানি ব্যবস্থায় বেশ কিছু বাস্তব পরিবর্তন এসেছে, যা প্রায় প্রতিটি ইম্পোর্টার ও ব্যবসায়ীর কাজে প্রভাব ফেলবে। চলুন দেখা যাক কী বদলালো, এবং পাশাপাশি — নতুন নীতিতে কোন পণ্য আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, আর কোনটি শর্তসাপেক্ষ।
৫টি বড় পরিবর্তন — এক নজরে
LC ছাড়া আমদানির ঊর্ধ্বসীমা প্রত্যাহার
আগে চুক্তিভিত্তিক (non-LC) আমদানিতে বার্ষিক $500,000 সীমা ছিল। নতুন নীতিতে এই সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে — সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এটাই।
Free Trade Zone ও Central Bonded Warehouse
প্রথমবারের মতো FTZ ও কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউজের সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত হয়েছে — বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ট্রেড হাব করার লক্ষ্যে।
NRB বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধা
Non-Resident Bangladeshi (প্রবাসী)-দের আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা প্রথমবার যুক্ত হয়েছে, দেশে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিশেষ আমদানি সুবিধাসহ।
রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল সুবিধা
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য Free of Cost (FoC) কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হয়েছে।
খাদ্য-জ্বালানি সুরক্ষায় সরকারের নমনীয়তার ক্ষমতা
খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বা রপ্তানি বহুমুখীকরণে প্রয়োজনে সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পণ্যের শর্ত শিথিল করতে পারবে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো non-LC আমদানির ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়া — যদিও এর ফলে মনিটরিং ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য — যা কোনোভাবেই আমদানি করা যাবে না
নীতির পরিশিষ্ট-১ ('খ' অংশ)-এ সুনির্দিষ্টভাবে ২৮টি ক্যাটাগরির পণ্য আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু চেনা (আগের নীতিতেও ছিল), আর কিছু সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে যুক্ত হওয়া নতুন সংযোজন:
- ⛔বাংলাদেশের সীমারেখা সঠিকভাবে না দেখানো মানচিত্র, চার্ট ও গ্লোব
- ⛔হরর কমিকস, অশ্লীল ও নাশকতামূলক সাহিত্য, পোস্টার, ফিল্ম, অডিও-ভিডিও ক্যাসেট
- ⛔ধর্মীয় বিশ্বাস বা অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এমন যেকোনো বই, প্রকাশনা বা বস্তু
- ⛔সেকেন্ডারি/সাব-স্ট্যান্ডার্ড, পুরাতন, ব্যবহৃত বা রিকন্ডিশন্ড পণ্য (নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া)
- ⛔রিকন্ডিশন্ড অফিস ইকুইপমেন্ট, ফটোকপিয়ার, টাইপরাইটার, টেলেক্স, পুরাতন কম্পিউটার/ইলেকট্রনিক্স
- ⛔জীবিত শূকর ও শূকরজাত সকল পণ্য
- ⛔শিল্প স্লাজ (Industrial Sludge), স্ল্যাগ থেকে তৈরি সার এবং যেকোনো বর্জ্য পদার্থ
- ⛔শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী নির্ধারিত মাত্রার বেশি শব্দের হর্ন
- ⛔Stockholm Convention (POPs)-এর আওতাভুক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক পণ্য — Aldrin, DDT, Dieldrin, PCB, Lindane, Mercury compounds ইত্যাদি
- ⛔ক্যাসিনো ও জুয়া খেলায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম
- ⛔কাঁচা পপি সীড, গাঁজা (Cannabis Sativa) ও ভাং
- ⛔ওয়াইন লীজ ও আরগোল
- ⛔লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (LNG), লিকুইফাইড প্রপেন-বিউটেনস (LPG-বহির্ভূত) ও অন্যান্য গ্যাসীয় হাইড্রোকার্বন
- ⛔পেট্রোলিয়াম কোক ও পেট্রোলিয়াম বিটুমিন ব্যতীত পেট্রোলিয়াম তেলের সকল রেসিডিউ
- ⛔সোডিয়াম সাইক্লামেট (ঘন চিনি) ও কৃত্রিম সরিষার তৈল (অ্যালাইল আইসোথায়োসায়ানেট)
- ⛔পলিপ্রোপাইলিন ও পলিইথিলিন ব্যাগ
- ⛔দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনসহ থ্রি-হুইলার যানবাহন ও চেসিস (টেম্পু, অটোরিক্সা ইত্যাদি)
- ⛔গ্যাস সিরিঞ্জ, পুরাতন বা ব্যবহৃত মোটর সাইকেল
- ⛔Meat and Bone Meal (MBM) — মৎস্য ও পশু খাদ্য, সার বা জ্বালানি হিসেবে যেকোনো ফরমেটে
- ⛔সকল প্রকার পুরাতন/ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি (Electric Vehicle)
- ⛔সকল প্রকার গিলনেট (কারেন্ট জাল)
লক্ষণীয়: POPs রাসায়নিক তালিকা, শব্দদূষণ বিধিমালা ২০২৫-এর রেফারেন্স, Meat & Bone Meal, এবং ব্যবহৃত ইলেকট্রিক গাড়ির উপর নিষেধাজ্ঞা — এই সংযোজনগুলো সাম্প্রতিক পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত মানদণ্ডের সাথে নীতিকে সাযুজ্যপূর্ণ করার প্রচেষ্টা প্রতিফলিত করে। আপনার আমদানি তালিকায় এই ধরনের কোনো পণ্য থাকলে HS কোড ধরে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
নিয়ন্ত্রিত ও শর্তসাপেক্ষ পণ্য — নির্দিষ্ট শর্ত মানলে আমদানিযোগ্য
নিষিদ্ধ তালিকার বাইরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরি আছে — যেসব পণ্য সরাসরি নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু নির্দিষ্ট শর্ত, লাইসেন্স বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া আমদানি করা যাবে না। কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:
- ⚠কীটনাশক (Cyhalothrin, Cypermethrin, Deltamethrin ইত্যাদি) — কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিবন্ধন ও বালাইনাশক বিধিমালা, ১৯৮৫ অনুযায়ী লেবেলিং বাধ্যতামূলক
- ⚠Ground Rock Phosphate — নির্দিষ্ট মান (২৮% ফসফেট, পার্টিকল সাইজ) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের ল্যাব টেস্ট পাসের শর্তে
- ⚠সিগারেট পেপার ও আর্টিফিশিয়াল ফিলামেন্ট টৌ — শুধুমাত্র VAT-নিবন্ধিত সিগারেট/বিড়ি উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান আমদানি করতে পারবে
- ⚠পরিশোধিত এডিবল অয়েল — বাল্ক আকারে, নির্দিষ্ট সংরক্ষণ ট্যাংক ও মেয়াদ উল্লেখ থাকার শর্তে
- ⚠ইথানল (ইথাইল অ্যালকোহল) এনালার গ্রেড — শুধুমাত্র স্বীকৃত ঔষধ শিল্প প্রতিষ্ঠান, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমতিসহ
- ⚠যুদ্ধ জাহাজ — কেবল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক আমদানিযোগ্য
- ⚠তরবারি ও বেয়োনেটসহ পণ্য — কেবল ব্যবহারকারী সংস্থাসমূহ কর্তৃক প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের ভিত্তিতে
- ⚠সাউন্ড ট্র্যাক/টাক ছাড়া চলচ্চিত্র — নির্দিষ্ট ভাষা ও সাবটাইটেল শর্তে, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি সাপেক্ষে
- ⚠ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল ও মোড়ক সামগ্রী — ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদিত ব্র্যাকলিস্ট (তালিকা) অনুযায়ী
ব্যবসায়িক আমদানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিধান
- বাণিজ্যিক আমদানি (৫ম অধ্যায়): নিয়ন্ত্রিত পণ্যের তালিকা বহির্ভূত সকল শিল্পের কাঁচামাল, মোড়ক সামগ্রী ও খুচরা যন্ত্রাংশ চুক্তিতে নির্ধারিত পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অবাধে আমদানিযোগ্য। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত বিদেশি কোম্পানিও প্রধান নিয়ন্ত্রকের পূর্বানুমতি ছাড়াই নিজস্ব বাণিজ্যিক আমদানি নিবন্ধন সনদপত্রের বিপরীতে আমদানি করতে পারবে।
- ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল: মহাপরিচালক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদিত ব্র্যাকলিস্ট বহির্ভূত কোনো পণ্য অবাধে আমদানিযোগ্য হলেও, তা ঔষধ শিল্প প্রতিষ্ঠান আমদানি করতে পারবে না — অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যতিক্রম নেই।
- ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য (৯ম অধ্যায়): এই ক্যাটাগরির পণ্যের জন্য পৃথক একটি অধ্যায় বরাদ্দ রয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও মান সনদের শর্তাবলী নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
- BSTI মানসনদ বাধ্যতামূলক পণ্য (পরিশিষ্ট-৪): বাটার, লিকুইড গ্লুকোজ, মধু, ইনফ্যান্ট ফর্মুলা, চকোলেট, রিফাইন্ড সুগার, মিল্ক পাউডার-সহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের জন্য নির্দিষ্ট বাংলাদেশ মান (BDS) সনদ ছাড়া কাস্টমস ছাড় পাবে না।
আমদানিকারকদের জন্য এখন কী করণীয়
- আপনার পণ্যের HS কোড নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ তালিকার সাথে মিলিয়ে দেখুন — বিশেষ করে যদি পণ্যটি রাসায়নিক, ইলেকট্রনিক্স, খাদ্যপণ্য বা যানবাহন সংক্রান্ত হয়।
- non-LC চুক্তিভিত্তিক আমদানির নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে চাইলে ব্যাংক ও কাস্টমসের সাথে ডকুমেন্টেশন যথাযথভাবে সমন্বয় করুন — সীমা উঠে গেলেও নজরদারি বেড়েছে।
- BSTI-বাধ্যতামূলক পণ্য আমদানি করলে আগেভাগেই মানসনদ সংগ্রহ নিশ্চিত করুন, নাহলে বন্দরে আটকে থাকবে।
- নতুন কোনো ব্যবসা শুরু বা পণ্য বৈচিত্র্য আনার আগে সংশ্লিষ্ট চ্যাপ্টারের সম্পূর্ণ শর্তাবলী একবার C&F এজেন্টের মাধ্যমে যাচাই করিয়ে নিন।
নতুন Import Policy Order একদিকে ব্যবসাকে সহজ করেছে (LC-নির্ভরতা কমিয়ে), অন্যদিকে নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরও সুনির্দিষ্ট করেছে। R. J. Syndicate নিয়মিতভাবে এই নীতির আলোকে আমদানি শ্রেণিবিন্যাস যাচাই করে থাকে — আপনার পণ্যের তালিকা পাঠান, আমরা যাচাই করে জানিয়ে দেব কোনো ধারা প্রযোজ্য কিনা।